কারফিউ, ক্যানভাস ও বন্দিত্ব: ডিজিটাল দমন-পীড়নের মানবিক মাশুল

This post is also available in: English Malay

জুলাই বিপ্লবের প্রতিনিধিত্বকারী দেয়ালে একটি গ্রাফিতি। ছবি জুলাই গ্রাফিতির ফেসবুক পেজ থেকে। অনুমতিক্রমে ব্যবহার করা হয়েছে।

সুবিনয় মুস্তফী ইরন

রুক্ষ, সাদা-কালো ফ্রেমে নির্মিত ইশতিয়াক আহমদ জিহাদের “হুইস্পারস অব দি ইংক” জুলাই আন্দোলন চলাকালীন ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধের ধ্বংসাত্মক পরিণতিকে তুলে ধরেছে। শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা জুলাই আন্দোলনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্র মানুষের জীবনে ডিজিটাল অধিকার লঙ্ঘনের বাস্তব ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাবগুলো চিত্রিত করেছে। 

যোগাযোগ, প্রতিবাদ, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ কিংবা তথ্যের অধিকার চর্চায় ইন্টারনেটের গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি এক বিবাহিত দম্পত্তির করুণ সংগ্রামের গল্পের সাহায্যে এই চলচ্চিত্র ডিজিটাল অধিকার লঙ্ঘনের এক ট্রাজিক পরিণতিও প্রদর্শন করেছে। সামাজিক মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনকে সমর্থন করে কার্টুন আঁকা শিল্পী রাশেদ কর্তৃপক্ষের হাতে গোপনীয়তা লঙ্ঘন তথা নজরদারির শিকার হয়। একটি কর্তৃত্বপরায়ণ রাষ্ট্রের জন্য শিল্পসত্ত্বা যেভাবে বিপদজনক হয়ে উঠতে পারে, তার সুন্দর দৃষ্টান্ত রাশেদের পরিণতি। অন্যদিকে, ইন্টারনেট সংযোগহীনতার কারণে চিকিৎসা সেবা পেতে ব্যার্থ তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রুনার জীবন হুমকীর মুখে পড়ে।  ডিজিটাল পরিসর যে কেবল মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য নয়, বরং মানবজীবনকে রক্ষার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা খুব দক্ষতার সাথে এই চলচ্চিত্র উপস্থাপন করেছে। একইসাথে, ডিজিটাল অধিকার দমন যেভাবে বাস্তব জীবনে দুর্ভোগ সৃষ্টি করে, তা-ও “হুইস্পারস অব দি ইংক” নির্মমভাবে তুলে ধরেছে।

বাংলাদেশকে কাঁপিয়ে দেয়া দিনগুলি

সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ২০২৪ সালে জুলাইয়ে একটি বড় গণ-অভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হয়। প্রথমে নির্দিষ্ট কিছু অসন্তোষকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও মধ্য জুলাইয়ে সরকার ও শাসক দলের কঠোর ও সহিংস দমন পীড়নের পর এই আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। নিষ্ঠুর দমন-পীড়নের মুখেও আন্দোলনকারীরা অবিচল থাকে, তাদের প্রচেষ্টা আরও তীব্রতত করে এবং দেশজুড়ে বিস্তৃত সমর্থন অর্জন করে। 

আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে সরকার কারফিউ আরোপ করে। জুলাই ১৭ থেকে অগাস্ট ৫ পর্যন্ত সরকার ইন্টারনেট ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে ব্যাপক প্রতিবন্ধকতা তৈরী করে। আংশিক মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ রাখা, ইন্টারনেট গতি কমিয়ে দেয়া কিংবা কখনো সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ব্লাকআউট– সরকার সৃষ্ট্র প্রতিবন্ধকতার ধরণ ছিল বহুবিধ। জুলাই ১৭ থেকে ২৮ এর মধ্যে সবথেকে শক্তিশালী ইন্টানেট ব্লাকআউট গুলি ঘটে। আর, সরকারী দমন পীড়ন ও নিপীড়নের মাত্রা এই সময়েই ছিল সর্বোচ্চ। (শাটডাউন ও কারফিউ চলাকালীন) এ সময়ে দুইশরও অধিক আন্দোলনকারী প্রাণ হারায়৷ যদিও বাংলাদেশে ইন্টারনেট শাটডাউন নতুন কোন ঘটনা নয়, এই শাটডাউনে পরিণতি ছিল বিশেষভাবে বিপদজনক— যা ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ ও সাধারণ মানুষের মৃত্যুর সংযোগস্থলকে স্পষ্ট করে তোলে। 

চলচ্চিত্রে উঠে আসা গল্পটি আরব বসন্ত ও হংকং এ ঘটা আন্দোলনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে সামাজিক মাধ্যম একইসাথে বিরোধীতা ও প্রতিরোধের প্লাটফর্ম  এবং সরকারী নিপীড়নের সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে। গল্পের চরিত্র রাশেদ যেমন তার প্রতিবাদী শিল্পকর্ম প্রকাশের জন্য সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহার করেছে, তেমনি হাজারো বাংলাদেশী নিজেদের সংগঠিত করতে, অধিকারের জন্য জনসমর্থন তৈরি করতে, আলোচনা করতে কিংবা সংহতি জানাতে এই প্লাটফর্ম গুলির উপর নির্ভর করে। মূলধারার গণমাধ্যম যখন রাষ্ট্রীয় দমন পীড়নের মুখে নিশ্চুপ, তখন সামাজিক মাধ্যম হয়ে উঠেছে দাবী জানানো ও ন্যায়বিচারের লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্লাটফর্মে৷ রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে সামাজিক মাধ্যমের এই তাৎপর্যের কারণে তা রাষ্ট্রীয় নজরদারি ও নিপীড়নের কেন্দ্রে স্থান পেয়েছে, যার অনিবার্য পরিণতি ছিল রাস্তায় ফোন ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট চেক করা,  অনলাইন কার্যক্রমের উপর ভিত্তি করে গ্রেফতার সহ আরো বহুবিধ নিপীড়ন। 

জুলাই বিপ্লবের প্রতিনিধিত্বকারী দেয়ালে একটি গ্রাফিতি। ছবি জুলাই গ্রাফিতির ফেসবুক পেজ থেকে। অনুমতিক্রমে ব্যবহার করা হয়েছে।

দমনের স্থাপত্যঃ ডিজিটাল যুগে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন 

এই চলচ্চিত্র কার্যকরীভাবে রাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত নিষেধাজ্ঞার (যা কেবল ইন্টারনেট শাটডাউনের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়) বিপজ্জনক পরিণতি চিত্রায়িত করে। সামাজিক মাধ্যম বন্ধ করে দেয়া কিংবা রাস্তায় মোবাইল ফোন চেক করার মাধ্যমে নাগরিকদের গোপনীয়তা ভঙ্গ করা, এইসবও এই গল্পের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বাস্তব ঘটনার অনুপ্রেরণায় গড়া এই দৃশ্যগুলো রাষ্ট্রীয় দমন পীড়নের নানাবিধ কৌশলকে উন্মোচিত করে, যা ২০২৩ সালের নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমাবেশে বাংলাদেশে ব্যবহৃত হয়েছিল। বিক্ষোভকারীদের শনাক্ত করতে নির্বিচারে  মোবাইল ফোন পরীক্ষা করা (যার পরিণতি ছিল শারীরিক নির্যাতন ও নির্বিচার আটক) ছিল বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৩ নং অনুচ্ছেদে প্রদত্ত গোপনীয়তার অধিকারের সরাসরি পরিপন্থী। আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এসব রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহার হিসেবে বর্ণনা করেছে। তারা জোর দিয়ে বলেছেন, এই ধরনের কার্যকলাপ আইনের শাসনকে উপেক্ষা করে। একইসাথে, তারা ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানান।

বিক্ষোভের পূর্বেও কঠোর আইন প্রয়োগ করে সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (DSA) ও এর উত্তরসূরি সাইবার নিরাপত্তা আইন (CSA) এর মাধ্যমে কার্টুনিস্ট ও শিল্পীদের স্বাধীনতা খর্ব করেছে। ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং এর উত্তরসূরী সাইবার সিকিউরিটি আইন (২০২৩) উভয়ই মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। এসব আইনের বিভিন্ন অস্পষ্ট ধারার মাধ্যমে কার্যত বহুবিধ অনলাইন কর্মকাণ্ডকে অপরাধযোগ্য করে তোলা হয়েছে। এই আইনের বলে দুর্নীতি-বিরোধী ও সরকারের বিরোধী ব্যঙ্গচিত্র আঁকার কারণে কয়েকজন শিল্পী ও কার্টুনিস্টকে কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে হয়। এমনকি অনেকের বিরুদ্ধে “আপত্তিকর” বা “মানহানিকর” কার্টুন আঁকার অভিযোগে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে ঘটা সাম্প্রতিক আন্দোলন গুলিতে ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে নির্বিচার আটক একটি সাধারণ ঘটনা হয়ে উঠেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক স্মৃতি সিংহ এই ধরনের কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে জনগণের মধ্যে ভয় সঞ্চার ও মৌলিক অধিকার দমনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ৯,০০০-এর বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার এবং ২ লক্ষ ১৩ হাজারেরও বেশি অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করে অস্পষ্ট ধারায় মামলা দায়েরের ঘটনা রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের ব্যাপকতাকেই স্পষ্ট করে। আইনের ফাঁকফোকরকে কাজে লাগিয়ে কর্তৃপক্ষ আন্দোলনকারী, বিরোধী দলীয় নেতা এবং সাধারণ নাগরিকদের নির্বিচার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার ব্যবস্থা তৈরি করেছে। এর পরিণতিঃ সমাজে ভয়ের পরিবেশ তৈরী এবং জনআস্থার অবক্ষয়।

ডিজিটাল অধিকার হলো মানবাধিকার 

ইন্টারনেট শাটডাউন এবং গোপনীয়তা লঙ্ঘন যেভাবে মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে (বিশেষ করে আন্দোলনকালীন), তা জিহাদের এই চলচ্চিত্র প্রদর্শন করেছে। রাজনৈতিক সংকটকালীন একটি দম্পত্তি যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়, তার এক আবেগময় গল্প বলে এই চলচ্চিত্র৷ ডিজিটাল পরিসর যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠরূপে আমাদের জীবনের সাথে জড়িত এবং তথ্যের অধিকার চর্চা ও নাগরিক অধিকার রক্ষা যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তার স্পষ্ট চিত্রায়ন, এই চলচ্চিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। ইন্টারনেট শাটডাউন এবং আন্দোলনের সমর্থনে  শিল্পকর্ম তৈরী করা শিল্পীদের গ্রেফতার ও গোপনীয়তা ভঙ্গের মাধ্যমে সরকার কেবল আন্দোলনকে দমন করে না; বরং তা জরুরী সেবা পাওয়ার অধিকার ক্ষুন্ন করে, মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে এবং অসমতা ও অন্যায়কে আরো বাড়িয়ে দেয়।