This post is also available in:
English
Malay

লিখেছেন: শোয়েব আব্দুল্লাহ
তাওসিন জাফরের চলচ্চিত্র “দি ব্লাক কাইট” এ ক্রাচের উপর ভর করে হাঁটা আরিফ একটি ভয়ংকর বাস্তবতার সম্মুখীন হয়, যখন সরকার কর্তৃক আরোপিত ইন্টারনেট শাটডাউনের ফলে তার জীবিকা হুমকীর মুখে পড়ে৷ এই চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি তাৎপর্যপূর্ণ মূহুর্তকে তুলে ধরতে পেরেছে। কেননা, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি বহুল ব্যবহৃত হাতিয়ারে রূপান্তরিত হয়েছে ইন্টারনেট ব্লাকাউট, এবং এই চলচ্চিত্র অত্যন্ত সফল রূপে একটি ক্রমবর্ধমান রূপে কর্তৃত্ববাদী পরিমণ্ডলে ডিজিটাল শ্রমের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থাকে চিত্রায়িত করেছে।
শিক্ষার্থী আন্দোলনের উত্থান
২০২৪ সালের জুলাই পাঁচ থেকে বাংলাদেশ একটি রূপান্তরকামী শিক্ষার্থী আন্দোলনের সাক্ষী হয়েছে। এই আন্দোলন সরকারী চাকরিতে কোটা প্রথা সংস্কারের জন্য শুরু হলেও পরবর্তীতে পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি বৃহত্তর সংগ্রামে। সামাজিক মাধ্যম সমন্বয়ের মাধ্যমে নেতৃত্ব উঠে আসায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন একটি তৃণমূল চরিত্র লাভ করেছে এবং এই বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমেই তা নিজেকে প্রথাগত আন্দোলন থেকে আলাদা করেছে।
বাংলা ব্লকেড এবং মার্চ ফর জাস্টিস এর মতো প্রোগ্রামের মাধ্যমে এই আন্দোলন নিজেকে স্বতন্ত্রমণ্ডিত করেছে। শিক্ষার্থীরা মোবিলাইজেশনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহার করায় প্রথাগত সংবাদ মাধ্যম গুলোর উপর নির্ভরতা কমেছে এবং তৈরী হয়েছে নতুন ধরণের ডিজিটাল প্রতিরোধ।
ডিজিটাল শ্রম
সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল ত্বরিত এবং কঠোর। আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে জুলাইয়ের শুরুতে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক কর্মীদের সহিংস ক্রাকডাউনের পর সরকার ১৫ দিন ইন্টারনেট বন্ধ করে রাখে। এই শাটডাউন বাংলাদেশের ডিজিটাল পরিসরের অরক্ষিত অবস্থাকে প্রকাশ করে দিয়েছে।
ফ্রিল্যান্সিং সেক্টরে এই শাটডাউনের প্রভাব ছিল বিশেষভাবে বিপদজনক। আরিফের মতো ফ্রিল্যান্সাররা বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির একটি বড় অংশকে তুলে ধরে; যারা পর্যাপ্ত প্রথাগত চাকরির অভাবে এবং প্রতিবন্ধকতার (যে কারণে তারা প্রথাগত চাকরি করতে পারে না) কারণে ফ্রিল্যান্সিংকে বেছে নেয়। স্থিতিশীল ইন্টারনেটের উপর নির্ভরশীলতা ফ্রিল্যান্সারদেরকে রাজনৈতিক কারণে আরোপিত শাটডাউন গুলোর প্রতি আরো অরক্ষিত করে তোকে।
ফ্রিল্যান্স খাত সর্বদা বিভিন্ন অনিশ্চয়তার মধ্যে পরিচালিত হয়। ডিজিটাল শ্রমিকরা ক্রমাগত বহুবিধ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়: চাকরির অনিশ্চয়তা , প্রথাগত চাকরিতে উপস্থিত বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার অভাব, বৈশ্বিক বাজারের চাহিদার উপর নির্ভরশীল আয়, এবং পারিশ্রমিক নির্ধারণের ক্ষেত্রে সামষ্টিক দর কষাকষি ক্ষমতার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি। অন্যদিকে, প্ল্যাটফর্ম-ভিত্তিক কাজগুলো প্রায়ই প্রচলিত শ্রম সুরক্ষা আইন এড়িয়ে যায়। একারণে ইন্টারনেট পরিষেবা বিঘ্নিত হলে সেফটি নেটহীন শ্রমিকরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার
কিপ ইট অন কোয়ালিশন ইন্টারনেট শাটডাউনকে সংজ্ঞায়িত করেছে নেটওয়ার্ক ব্লাকাউট, বিভিন্ন অ্যাপের উপর নিষেধাজ্ঞা, ইন্টারনেটের গতি কমানো ইত্যাদির মাধ্যমে যোগাযোগ স্বাধীনতার উপর ইচ্ছাকৃত সরকারী হস্তক্ষেপ হিসেবে। সরকার নিরাপত্তা ঝুঁকির অযুহাত দিয়ে ইন্টারনেট শাটডাউনকে বহুবার বৈধতা দানের চেষ্টা করলেও গবেষণা বলছে এই পদক্ষেপ অনেকটাই অকার্যকর তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে।
বাংলাদেশে ইন্টারনেট শাটডাউনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ২০১৯ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২১ সালে কুমিল্লায় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সংঘাত, প্রায় সকল ক্ষেত্রেই সরকারী প্রতিক্রিয়া ছিল ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়া। ইন্টারনিউজের অপটিমা প্রজেক্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে মধ্য ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে এমন ১৭টি ঘটনা ঘটেছে।
অবস্থা এখনো সঙ্গিন। ২০২২ সালে বৈশ্বিক ইন্টারনেট শাটডাউন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল পঞ্চম এবং এ বছর ছয়টা শাটডাউন ছিল বিরোধী দলের সমাবেশকালীন।
শাটডাউনের প্রকৃত মূল্য
শাটডাউনের সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক প্রভাব কেবল পরিসংখ্যান দ্বারা তুলে ধরা সক্ষম নয়৷ গ্লোবাল কস্ট অব ইন্টারনেট শাটডাউনের প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে যে, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট বন্ধের কারণে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৭.৬৯ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, দি নেটব্লকস কস্ট অব শাটডাউন টুলের মতে, একদিন ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার কারণে আনুমানিক বাংলাদেশ প্রতিদিন ৭৪ মিলিয়ন ডলার হারাতে পারে। সাম্প্রতিক ইন্টারনেট শাটডাউন ফ্রিল্যান্সিং খাতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে; শুধু ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট ব্লাকাউটেই ক্ষতির পরিমাণ কোটি টাকার বেশি ছাড়িয়েছে।
কেবল অর্থনৈতিক নয়, মানবিক ক্ষতির মাত্রাও ছিল সমানভাবে গুরুতর। সময়মতো কাজ সম্পন্ন করতে না পারা ও অনিশ্চিত সংযোগের কারণে ক্লায়েন্টদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে। ইন্টারনেট সেবা পুনরায় চালু হওয়ার পরও ক্লায়েন্টদের সাথে সম্পর্কে অবনতি দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারণে পরিণত হয়েছে। শুধু ফ্রিল্যান্সিং নয়, ইন্টারনেট বন্ধের ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও দৈনন্দিন ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। যার অনিবার্য পরিণতি ছিক সমাজে অর্থনৈতিক অস্থিরতা।

প্রতিরোধ ও সংস্কার
যদিও আন্তর্জাতিক নীতি অনুযায়ী, কেবল “অনন্য সাধারণ” পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট শাটডাউনকে বৈধ ও প্রয়োগযোগ্য , বাংলাদেশ সরকার কোন ধরণের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছাড়া নিজ খেয়াল খুশি অনুযায়ী ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। এইসব সরকারী পদক্ষেপ বাস্তবায়নে সহায়তাকারী মোবাইল অপারেটররা খুব কম সময়ই ব্যবহারকারীদের শাটডাউনের পূর্বে কিংবা পরে অবহিত করে।
যদিও বাংলাদেশ একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে, ডিজিটাল অধিকার সুরক্ষার জন্য নিষ্ক্রিয় ও অসাড় আশার থেকেও বেশী কিছু প্রয়োজন। ডিজিটাল শ্রমিকদের জন্য সামষ্টিক সহায়তা নেটওয়ার্ক ও বিকল্প যোগাযোগ ব্যাবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। ভবিষ্যৎ শাটডাউন কার্যকরভাবে মোকাবেলায় নাগরিক সমাজের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা নির্ধারণ করা উচিত। তবে ডিজিটাল অধিকার সুরক্ষায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ইন্টারনেট সেবা বিঘ্ন হওয়ার প্রেক্ষিতে জবাবদিহিতা কাঠামো নির্মাণের নাগরিক দাবী এক্ষেত্রে সবথেকে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
“দি ব্লাক কাইট” চলচ্চিত্রে চিত্রিত বিপর্যয় কেবল ইন্টারনেট সংযোগের বিষয় নয়— বরং তা ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ, এবং আধুনিক সমাজে অংশগ্রহণের মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন। পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলা বাংলাদেশে নাগরিকদের দায়িত্ব হলো সজাগ থাকা ও এসব মৌলিক স্বাধীনতা রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা রাখা। সত্যি কথা বলতে, ডিজিটাল অধিকার সুরক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে নয়, বরং জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তি ও তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের মাধ্যমে।